প্রচলিত আইনের ইসলামিকরণ: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ | ড. আহমদ আলী

Spread the love

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামী আইনচিন্তার সম্পর্ক, সামঞ্জস্য ও প্রয়োগযোগ্যতা নিরূপণ সমকালীন আইন ও রাষ্ট্রচিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল ও বহুমাত্রিক গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও নৈতিকতার ক্রমপরিবর্তনশীল বাস্তবতায় ইসলামী শরীয়াভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রচলিত আইনসমূহের পর্যালোচনা কেবল একটি তাত্ত্বিক অনুশীলন নয়; বরং এটি একটি সময়োপযোগী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস।
যদিও বিষয়টির তাত্ত্বিক গুরুত্ব ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য, তথাপি প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে কোনো গ্রন্থ প্রণয়নের পরিকল্পনা আমার ছিল না। বিষয়টির ব্যাপকতা, তাত্ত্বিক গভীরতা ও নীতিগত সংবেদনশীলতার কারণে আমি নিজেকে এ ধরনের একটি গবেষণামূলক কাজের জন্য যোগ্য মনে করিনি। এমন অবস্থায় গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা-এর সম্মানিত নির্বাহী পরিচালক জনাব শহীদুল ইসলাম চট্টগ্রামে একটি পার্টিসিপেটরি সেমিনার আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের ইসলামিকরণ: সমস্যা ও উত্তরণের পথ’ শিরোনামে আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করেন। এ উপলক্ষে তিনি আমাকে উক্ত বিষয়ে একটি কনসেপ্ট পেপার প্রণয়ন করার জন্য অনুরোধ জানান এবং একই সঙ্গে আয়োজিত সেমিনারে কী-নোট স্পিকার হিসেবে তা উপস্থাপনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁর আন্তরিক অনুরোধ উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে আমি কনসেপ্ট পেপারটি প্রস্তুত করি এবং তা ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বাইতুশ শরফ ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম এবং ইসলামিক ল’ রিসার্চ সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপন করি।
সেমিনারে উপস্থিত বিজ্ঞ আলোচকবৃন্দের গভীর আগ্রহ ও মূল্যবান মতামত এবং শ্রোতৃম-লীর বিষয়ভিত্তিক মনোযোগ আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই দিনই আমার মনে দৃঢ়ভাবে এ উপলব্ধি জন্মে যে, আলোচ্য বিষয়টি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে উপস্থাপন করা সময়ের দাবি। এই উপলব্ধি থেকেই কনসেপ্ট পেপারটি পুনঃপর্যালোচনা, সংশোধন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে জার্নাল-উপযোগী প্রবন্ধে রূপ দেওয়া হয় এবং তা ইসলামী আইন ও বিচার পত্রিকার ৮৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে উক্ত প্রবন্ধটিকে আরও পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও হালনাগাদের মাধ্যমের বর্তমান গ্রন্থটি প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এই গ্রন্থটি মূলত সেই কনসেপ্ট পেপারেরই পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ।
এ ক্ষেত্রে ইসলামিক ল’ রিসার্চ সেন্টারের সম্মানিত নির্বাহী পরিচালক জনাব শহীদুল ইসলামের প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁর আন্তরিক আগ্রহ, সদিচ্ছা ও নিরন্তর উৎসাহ না থাকলে হয়তো এ কনসেপ্ট পেপারটি প্রস্তুত করা সম্ভব হতো না এবং এই গ্রন্থটিও প্রকাশের সুযোগ লাভ করতো না।
আরও উল্লেখ্য যে, গ্রন্থটির চূড়ান্ত রূপ প্রদানে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মৌলিক ও সহায়ক গ্রন্থের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান-সহায়ক মাধ্যম হিসেবে চ্যাটজিপিটির সহায়তা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষত বিভিন্ন চিন্তার সুসংগঠিত বিন্যাস, বিষয়বস্তুর উপস্থাপনগত স্বচ্ছতা এবং ভাষাগত সৌন্দর্য ও সাবলীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ মাধ্যম থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।
এই ক্ষুদ্র গ্রন্থটি প্রণয়নের পেছনে যে প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ কার্যকর রয়েছে, সেগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ-
ক. সাধারণ আইন ও ইসলামী আইন সম্পর্কে মৌলিক ধারণা প্রদান করা; উভয় আইনের উৎস, প্রকৃতি ও প্রকারভেদ বিশ্লেষণ করা; এবং এ দুই আইনব্যবস্থার মধ্যকার কাঠামোগত ও বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যসমূহ উপস্থাপন করা।
খ. বাংলাদেশের প্রচলিত আইনব্যবস্থায় ইসলামী আইনের বিদ্যমান প্রয়োগ ও অবস্থান নিরূপণ করা; পাশাপাশি ‘আইনের ইসলামিকরণ’ বলতে কী বোঝায়Ñতা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা।
গ. গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিদ্যমান সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে প্রচলিত আইনব্যবস্থার ইসলামিকরণ আদৌ সম্ভব কি নাÑতা যাচাই করা।
ঘ. বাংলাদেশের প্রচলিত আইনব্যবস্থাকে ইসলামিকরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান মৌলিক সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেসব সমস্যা উত্তরণে সম্ভাব্য ও বাস্তবসম্মত কৌশল অনুসন্ধান করা।
ঙ. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শরীয়া আইন বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া, ধাপ ও পদ্ধতিসমূহ নির্ণয় করা এবং সেগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা।
চ. গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শরীয়া আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমানÑসে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করা এবং সম্ভাব্য উত্তরণমূলক কৌশলসমূহ উপস্থাপন করা।
ছ. শরীয়া আইন বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলায় নীতিগত ও কৌশলগত উপায়সমূহ অনুসন্ধান করা।
উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যসমূহ গ্রন্থটিতে কতটুকু অর্জিত হয়েছেÑতা এর বিজ্ঞ পাঠকমহল মূল্যায়ন করবেন।
পরিশেষে বিনীতভাবে উল্লেখ করছি যে, আলোচ্য বিষয়টি সম্পর্কে এ গ্রন্থে উপস্থাপিত মতামতসমূহ মূলত একান্তই আমার প্রাথমিক ধারণা ও চিন্তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বিষয়টির ব্যাপকতা ও জটিলতা বিবেচনায় এ বিষয়ে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যে সীমিতÑএ কথা আমি অকপটে স্বীকার করছি। সুতরাং গ্রন্থটিতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি, সীমাবদ্ধতা বা বিশ্লেষণগত অপরিপক্বতা থেকে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। সম্মানিত পাঠকবৃন্দের দৃষ্টিতে যদি কোনো ভুল, অসঙ্গতি বা মতভেদযোগ্য বিষয় প্রতীয়মান হয়, তবে তা সদয়ভাবে অবহিত করলে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। আশা করি, ভবিষ্যতে বিজ্ঞ গবেষকগণ এ বিষয়ে আরও গভীর, পরিণত ও পদ্ধতিগত গবেষণার মাধ্যমে জাতিকে যথাযথ ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন।
গ্রন্থটি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করায় বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ সেন্টারের সম্মানিত নির্বাহী পরিচালক জনাব শহীদুল ইসলামকে আমি আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে-সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আল্লাহ তা‘আলা আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস কবুল করুন এবং এর অসীলায় আমাকে, আমার পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং এই গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল সহযোগীকে দুনিয়া ও আখিরাতে অগণিত কল্যাণে ভূষিত করুন। আমীন।

বই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন-প্রচলিত আইনের ইসলামিকরণ :পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

Scroll to Top